September 17, 2021, 5:22 pm

News Headline :
মতলব উত্তরে দি ইনভিন্সিবল ব্যাচ ৯/১১ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত ফিনল্যান্ডে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী করোনা ভাইরাসে আরও ৩৮ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১৯০৭ কুয়াকাটাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছে বিডি ক্লিন কুয়াকাটা টিম সোনারগাঁয়ে অজ্ঞাত মহিলার লাশ উদ্ধার চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হাজীগঞ্জে স্হাপনের দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত ভারতীয় সহকারি হাইকমিশনারকে মাস্ক উপহার দিলেন জেলা সমিতি কফি ও কাজুবাদামের চারা বিতরণ উদ্বোধন করলেন -কৃষিমন্ত্রী রাউজান প্রেসক্লাবে জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারীর ট্রাস্ট প্রকাশিত গ্রন্থ হস্তান্তর নওগাঁয় দুইশত পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ দু’জনকে আটক করেছে ডিবি পুলিশ

আমার ভালোবাসা- ভালোলাগা কামাল লোহানী- “সময়ের সাহস” এবং আমার স্মৃতিপটে তার চেতনা- অনুপ্রেঢ়না

এবিএম আতিকুর রহমান বাশার ঃ
সময়টা ১৯৯৯ সালের শেষ ও ২০০০ সালের প্রথম দিকের একটি স্মৃতির কথা দিয়েই শুরু করলাম। ২০০০ সালে কবি বেগম সুফিয়া কামাল’র স্মরনে দেবীদ্বার উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত একটি স্মরন সভায় কামাল রোহানী ছিলেন প্রধান অতিথি।
স্মরণ সভার আয়োজক ছিলেন “নিজেরা করি সংস্থা”। ওই সময় ওই অনুষ্ঠানে আমিও একজন আলোচক হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।
১৯৯৯সালের ১৮ নভেম্বর ঢাকা পিজি হাসপাতাল (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্বিবিদ্যালয়)’র ৮ম তলার একটি ক্যাবিনে আমার বড় মেয়ে তাছকিয়া রহমান প্রতিভার জন্ম হয়েছিল। ওই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার মামি শ্বাশুরী পিজি হাসপাতালের গাইনি বিভাগের ডা. নুররুন্নাহার রেখা এবং তার স্বামী মানে আমার বড় মামাশ্বশুর ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালের অর্থপেটিক বিভাগের প্রফেসর ডা. এসহাক’র সহযোগিতা ও তত্বাবধানে। ওই সময় কবি সুফিয়া কামাল অসুস্থ্য হয়ে একই ভবনের ১১তলায় চিকিৎসাধীন ছিলেন।
এ সময়ে আমার সময় কেটেছে ভবনের নিচের গেইটের পাশে, আমার কয়েকজন প্রাক্তন ছাত্র ইউনিয়নের বন্ধুর সাথে। তখন কবি সুফিয়া কামালকে দেখতে আসা দেশের শীর্ষ রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, লেখক, সাহিত্যিক সহ নানা পেশার লোকজনের সমাগম ছিল বেশী। আমার ওই বন্ধুদের সহায়তায় আগত অনেক নেতা, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, লেখক, সাংস্কৃতিক নেতা-কর্মীর সাথে দেখা, পরিচয় ও কথা হয়। ভাগ্যক্রমে কামাল লোহানীর সাথেও আলাপ পরিচয় হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।
১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর কবি সুফিয়া কামাল চলে গেলেন না ফেরার দেশে। পিজি হাসপাতাল কিছু সময়ের জন্য সর্বসাধারনের চলাচল বন্ধ ছিল। কারন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ রাস্ট্রের শীর্ষ ব্যাক্তিবর্গরা এসেছেন কবি সুফিয়া কামালের দেখতে।

সে সৌভাগ্য থেকে ২০০০ সালের পথম দিকে নারী নেত্রী খুশি কবির’র প্রতিষ্ঠিত এনজিও ‘নিজেরা করি সংস্থা’র উদ্যোগে কবি সুফিয়া কামালের স্মরনে দেবীদ্বারে একটি স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়। তখন নিজেরা করি সংস্থার চট্রগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি মিজানুর রহমান, বিভাগীয় সংগঠক বুলবুল ভাই, স্থানীয় সংগঠক জব্বার ভাই, আনোয়ার ভাই সহ অনেক সংগঠকের সাথে সম্পর্ক থাকায়, ওই স্মরণ সভায় আলোচক হিসেবে আমিও আমন্ত্রীত ছিলাম। ওই অনুষ্ঠানে আমাকে দেখে কামাল লোহানী অনেক আনন্দিত হলেন। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। পিজিতে থাকা অবস্থায় কবি সুফিয়া কামালকে নিয়ে আবেগ প্রবণ স্মৃতিচারণ কামাল লোহানীর মনে দাগ কেটেছিল। তাই তার আলোচনায় কবি বেগম সুফিয়া কামাল’র জীবন কর্ম তুলে ধরার পাশাপাশি আমার আলোচনারও রেফারেন্স ধরে অনেক আলোকপাত করেছেন তিনি। যা আমার সারা জীবন মনে রাখার মতো। আলোচনা শেষে তিনি আমাকে নিয়ে অন্যান্যদের সাথেও অনেক প্রশংসা, আলোচনা ও গল্প করেছেন। নারী নেত্রী খুশী কবিরও বিভিন্ন সময়ে আমার খোঁজ খবর নিতেন।
২০০৫ সালে হঠাৎ তিনি আমাকে খোঁজ করে একটি বই উপহার দিলেন। সে পর্যন্তও তিনি আমাকে মনে রেখেছিলেন। বইটি কামাল লোহানিকে নিয়ে লিখা দেশবরেণ্য ব্যক্তিদের লেখার সমন্বয়। বইটির নাম ছিল,- কামাল লোহানী- ‘সময়ের সাহস’। বইটির ভেতরের একটি পাতায় লিখে দিলেন, ‘প্রিয় মহোদয়কে’ অভিনন্দন সহ কামাল লোহানী, তারিখ- ২৪/০৭/২০০৫ইং।
পরবর্তিতে জোট সরকারের সময় ২০০৬ সালে চাঁদাবাজীর একটি রিপোর্ট করায় আমার বিরুদ্ধে উল্টো একটি চাঁদাবাজীর মামলা হয়েছিল। ওই হয়রানীমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে দেবীদ্বার, কুমিল্লা সহ জাতীয়ভাবে গোটা দেশে আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। এ আন্দোলন সাংবাদিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, গনসংগঠনগুলোর মধ্যেও প্রতিবাদের ঝর উঠতে থাকে। দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক কুমিল্লা কাগজ সহ দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকার সম্পাদকীয়তেও জোড়ালোভাবে প্রতিবাদ জানানো হয়। দেশের বাহিরের সাংবাদিক সংগঠন ও পত্রিকাগুলোও পিছিয়ে ছিলনা।
অবশ্য এ জাগরণের পেছনের শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন, দেশের আরো একজন প্রতিথযষা সাংবাদিক, তিনি হলেন সাংবাদিক নাঈমুল ইসলাম খান। তার প্রতিষ্ঠিত “বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভোলাপম্যান্ট এন্ড জার্নালিজম কনিউনিকেশন” (বিসিডেজেসি)। এ সংগঠন’র উদ্যোগে প্রায় প্রতিদিনই চলতে থাকে জাতীয় প্রেসক্লাব সহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ সভা, মানববন্ধন, জাতীয় শহীদ মিনারে মোমবাতি প্রজ্বলনে প্রতিবাদ।
বিসিডিজেসি’র উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাবে একের পর এক সাংবাদিক নির্যাতন বিরোধী সভা সেমিনার শুরু হয়। সভা-সেমিনারগুলোতে জাতীয় হাতেগুনা কিছু সংখ্যক রাষ্ট্রের উর্ধতন ব্যাক্তি ছাড়া সকল পেশার রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, কবি সাহিত্যিক, সাংষ্কৃতিক কর্মী সহ দেশবরেণ্য ব্যাক্তিবর্গরা ওই সভা- সেমিনারে অংশ নিয়েছেন।
ওই সময় শুধুমাত্র আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা ওই চাঁদাবাজীর মামলাকে কেন্দ্র করে প্রতিদিনকার নিউজ কাটিংগুলো ফটো কপি সংগৃহীত হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৫ হাজারেরও অধিক পৃষ্ঠা। সবচেয়ে বড় আন্দোলনটি হয়েছিল ২০০৭ সালের ১৩ এপ্রিল, দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবে বিসিডিজেসি’র উদ্যোগে আয়োজিত ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিক নির্যাতন বিরোধী সেমিনার’। ওই সেমিনারে তৎকালীন বাসস’র প্রধান সম্পাদক গাজিউল হক খান সহ জাতীয় সাত সাংবাদিক নেতা, কুমিল্লা জেলা ও বিভিন্ন উপজেলার প্রায় শতাধিক সাংবাদিক সহ সুশীল সমাজের প্রায় পাঁচ শতাধিক ব্যাক্তিবর্গ আমন্ত্রীত ছিলেন। তৎকালীন জোট সরকারের সন্ত্রাসীদের হামলায় সেমিনারটি পন্ড করে দিয়েছিল। গাজিউল হক খান সহ সকল নেতাদের মঞ্চ থেকে বরে করে দিয়েছিল ওরা। যার প্রভাব এক সময় দেশের বাহিরেও প্রতিবাদের ঝর উঠেছিল। কুমিল্লার তৎকালীন সময়ের এমন কোন সাংবাদিক ছিলেন না, যারা আমাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা এবং আন্দোলনে শরীক হতে যেয়ে বা দেবীদ্বারের নিউজ কভারেজ করতে যেয়ে হামলা- নির্যাতনের শিকার হননি। ওই সেমিনারে হামলাকে কেন্দ্র করে যে সূতিঘাকার সৃষ্টি হয়েছিল তা গোটা দেশের প্রায় প্রতিদিনের আন্দোলনে রুপ নিয়েছিল। যার ধারাবাহিকতায় দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাব ১৩ এপ্রিলকে প্রতি বছর ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিক নির্যাতন দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।
এসব অনুষ্ঠানগুলোতে কুমিল্লার সাংবাদিকদের মাঝে যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তেমনি জাতীয় পর্যায়েও ঐক্যের ডাক এসেছিল। জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রয়াত সাংবাদিক নির্মল সেন যেমন বিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোকে বিভেদ ভুলে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন, তেমনি আমাদের চেতনার বাতিঘর খ্যাত কামাল লোহানী,- জাতির অগ্রেচলার পথ রোধের অন্যতম প্রতিবন্ধক সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধের ও আহবান জানিয়েছিলেন।
কামাল লোহানী যে কটা অনুষ্ঠানে গিয়েছেন তিনি অনুষ্ঠান শুরুর আগে আমার খোঁজ নিয়েছেন, আমাকে মনে রেখেছেন, কুশলাদী বিনিময় করেছেন। আশির্বাদ করেছেন। যা ভোলার নয়, যদিও এ মানবকে কাছ থেকে তার আদর্শ লালনের সুযোগ হয়নি। তবুও বলব,- তিনি চলে যাওয়া মানে একজন পথ দেখানো মানুষকে হারিয়েছি। জাতির এ ক্রান্তিকালে কামাল লোহানীদের প্রস্থান মানে জাতির পথ দেখানো বাতিগুলোর একটি বাতি নিভে যাওয়া। আজ আমরা জাতির এ ক্রান্তিকালে তাকে হারানো মানেই প্রগতিশীল আন্দোলনে থমকে দাড়ানো।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তথা মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন কামাল লোহানী। গনতন্ত্র ও শোষনহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় আজীবন সংগ্রামী শ্রদ্ধেয় কামাল লোহানী ছিলেন জাতির আলোকবর্তিকা। সমাজতন্ত্র -সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার অনন্য সৈনিক, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই –সংগ্রামের শীর্ষ নেতা ছিলে তিনি। বিশিষ্ট বামপন্থী বুদ্ধিজীবি, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, উদীচীর সাবেক সভাপতি।
শ্রদ্ধেয় কামাল লোহানী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। এদেশের শোষিত নিপীড়িত মানুষের জন্য তাঁর অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছি লোহানী ভাইর প্রতি। তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও বিনম্র শ্রদ্ধা সহ বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।
এবিএম আতিকুর রহমান বাশার,
(রাজনীতিক, সাংবাদিক, লেখক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক),

Please Share This Post in Your Social Media

error: Content is protected !!