Breaking News
Home / আন্তর্জাতিক / সৌদি, কাতার নাকি আমিরাত- মাথানত করল কে?

সৌদি, কাতার নাকি আমিরাত- মাথানত করল কে?

প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে সৌদি আরব আর তার ঘনিষ্ঠ চার মিত্র- সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও বাহরাইন মিলে হঠাৎই কাতারের ওপর অর্থনৈতিক-কূটনৈতিক সর্বাত্মক অবরোধের ঘোষণা দেয়। আচমকা এমন অবরোধে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ছোট্ট উপসাগরীয় দেশটিতে। খাদ্য সংকটের আশঙ্কায় দোকানপাটে হামলে পড়ে মানুষজন। রাতারাতি ধস নামে দোহার শেয়ারবাজারে। মিসর, সৌদি, আমিরাতে আটকা পড়েন অসংখ্য কাতারি নাগরিক।

অথচ দু’দিন আগে যখন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি উপসাগরীয় জোটের (জিসিসি) সম্মেলনে যোগ দিতে সৌদি আরবের আল-উলা শহরে পৌঁছান, সেখানে তাকে রাজকীয় সম্মান দেখাতে হাজির হন স্বয়ং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। এখানেই শেষ নয়, এরপর তিনি নিজে গাড়ি চালিয়ে কাতারের আমিরকে আল-উলার প্রাচীন পুরাকীর্তি ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। এসব ভিডিও দিনভর প্রচারিত হয়েছে সৌদির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে।

একটিও শর্ত মানেনি কাতার
মজার বিষয় হলো, অবরোধ আরোপের সময় আল জাজিরা টিভি নেটওয়ার্ক বন্ধ, ইরানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ, তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি বন্ধসহ যে ১৩টি দাবি জানিয়ে আল্টিমেটাম দিয়েছিল সৌদি জোট, কাতার সেগুলোর একটিও পূরণ করেনি। অবরোধ দেয়ায় আন্তর্জাতিক আদালতে ওই চারটি দেশের বিরুদ্ধে যে মামলা করেছিল কাতার, শুধু সেটাই প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। এছাড়া আর কোনওদিক দিয়েই বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়নি ছোট দেশটি। এমনকি অবরোধ ওঠানো নিয়ে কারও সঙ্গে দেন-দরবারও করতে যায়নি দোহা। এ উদ্যোগ ছিল পুরোটাই সৌদি আরব, কুয়েত এবং যুক্তরাষ্ট্রের।

রাজনৈতিক ঝুঁকি সম্পর্কিত গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারেস্টের প্রধান এবং মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির বিশ্লেষক সামি হামদি বিবিসি বাংলাকে বলেন, সৌদি আরবই কাতারের সঙ্গে সমঝোতার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল। তারা যুক্তরাষ্ট্রে বাইডেন প্রশাসন নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। জো বাইডেন ক্ষমতা নেয়ার আগে যতটা সম্ভব বিতর্কিত বিষয়গুলো মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে তারা।

হামদি বলেন, কাতারের সঙ্গে সমঝোতায় একেবারেই আগ্রহী ছিল না সংযুক্ত আরব আমিরাত। কিন্তু সৌদির চাপে রাজি হতে হয়েছে তাদের। আমিরাত মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের কাছ থেকে চাপ আসলেও তা সামাল দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে তাদের। তারপরও, হয়তো সৌদি যুবরাজের কথা ফেলতে চাননি আবুধাবির যুবরাজ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম দিকে এই অবরোধ নিয়ে মাথা না ঘামালেও সম্প্রতি কাতার ও সৌদি আরবের মধ্যে সমঝোতায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কুয়েত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এই সমঝোতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল গত সেপ্টেম্বরে। প্রথমে শুধু কাতার-সৌদির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নিয়ে কথা হলেও দোহা পরে শর্ত দেয়, চুক্তি হতে হবে আরও বড় আকারে, অবরোধকারী বাকি তিনটি দেশকেও সঙ্গে রাখতে হবে।

ট্রাম্পের হঠাৎ উৎসাহ কেন?
ডোনাল্ড ট্রাম্প গত তিন বছর চুপচাপ থাকার পর ক্ষমতার শেষদিকে এসে হঠাৎ কাতার বিরোধ মেটাতে উৎসাহী হয়ে উঠলেন কেন?

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) গবেষক জন বি অল্টারম্যান জানান, মার্কিন প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্র দফতর হোয়াইট হাউসকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, কাতারের ওপর অবরোধে কোনও লাভ হচ্ছে না, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে একঘরে করার নীতির জন্য ক্ষতিকর।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একসময় বুঝতে পারে যে, গ্যাসসমৃদ্ধ কাতার অবরোধ সামলাতে পুরোপুরি সক্ষম। মধ্য দিয়ে এই অবরোধে লাভ হয়েছে ইরানের। ইরানিদের সঙ্গে কাতার যৌথভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়নে যে কাজ শুরু করেছিল, অবরোধের পর সেই সহযোগিতা আরও বেড়ে যায়। এছাড়া, সৌদি এবং আমিরাতের আকাশসীমা ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতার এয়ারওয়েজ বিকল্প হিসেবে ইরানের আকাশসীমা ব্যবহার শুরু করে, যার ফি হিসেবে প্রতিবছর তারা ১০ কোটি ডলার দিচ্ছে তেহরানকে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সেনাঘাঁটিও কাতারে। ফলে এই অবরোধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নীতি নির্ধারকের মধ্যেই প্রথম থেকে অস্বস্তি ছিল। এ নিয়ে তারা হোয়াইট হাউসকে সবসময় চাপের মধ্যে রেখেছিলেন।

অবরোধে আরও শক্ত হয়েছে কাতার
সৌদি আরব ভেবেছিল, জল-স্থল-আকাশে অবরোধের চাপে কাতারের অর্থনীতির এমন অবস্থা হবে যে, তারা হাঁটু গেড়ে আরব চতুষ্টয়ের দাবি মানতে বাধ্য হবে। শুরু কয়েকদিন সেরকমই পরিস্থিতি ছিল ২৫ লাখ জনসংখ্যার ছোট দেশটিতে। একদিকে খাদ্য সংকটের ভয়, অন্যদিকে শেয়ারবাজারে ধস। তারপরও আপস করতে রাজি হননি কাতারের ৩৭ বছর বয়সী আমির শেখ তামিম। এর বদলে সাহায্যের জন্য হাত বাড়ান তুরস্ক এবং ইরানের কাছে। সৌদি আরবের সঙ্গে বৈরি সম্পর্ক থাকা এ দুই দেশই জরুরি ভিত্তিতে খাবার পাঠায় কাতারে। সৌদি সামরিক অভিযান চালাতে পারে এমন শঙ্কায় তুরস্কের কাছে সামরিক সাহায্য চায় কাতার। তাদের হাত ধরে মাত্র এক বছরের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়ায় উপসাগরীয় দেশটি।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, গত সাড়ে তিন বছরের অবরোধে কাতারের অর্থনীতির ক্ষতি তো হয়নি, বরং তারা এখন খাদ্য উৎপাদনসহ অনেকে ক্ষেত্রেই স্বাবলম্বী। আন্তর্জাতিক মহলেও ছোট এই দেশটি তাদের সম্মান এবং ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।

এমনকি, সৌদি ও আমিরাতের বিশ্লেষকরাও বলছেন, এই সাড়ে তিন বছরে তাদের অবরোধে কিছুই অর্জিত হয়নি।

মাথা নুইয়েছে সৌদি আরব?
তাহলে কি যে সৌদি আরব পর্যদুস্ত করতে চেয়েছিল কাতারকে, এখন তারা নিজেরাই মাথা নত করছে? সামি হামদির মতে, অবরোধ তুলে নেয়ার ক্ষেত্রে পরাজয় যতটা না হয়েছে সৌদি আরবের, তার চেয়ে বেশি হয়েছে কাতারের ঘোরতর শত্রু সংযুক্ত আরব আমিরাতের।

তিনি বলেন, কাতারের সঙ্গে বড় প্রতিযোগিতা আসলে আমিরাতের। সৌদি অবশ্যই পথ বদলেছে, আর আমিরাত বাধ্য হচ্ছে সেই পথে হাঁটতে।

তাহলে প্রয়োজন না হলেও কাতার সমঝোতায় রাজি হলো কেন?
এ বিশ্লেষক মনে করেন, কাতার মূলত সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে চায়। এজন্যই তারা সৌদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করেনি।

তিনি বলেন, কাতার এখন চেষ্টা করবে আমিরাতের ওপর সৌদির নির্ভরতা কমিয়ে দিতে। তারা দেখাতে চাইবে, আমিরাত সৌদিকে যে ধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ফায়দা দিচ্ছে, কাতার তার চেয়েও বেশি দিতে পারে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Check Also

শিশু তহবিল কেলেঙ্কারি: ডাচ সরকারের পদত্যাগ

নিউজ ডেস্কঃ নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটের নেতৃত্বাধীন সরকার পদত্যাগ করেছে। শিশু কল্যাণ তহবিলের টাকা নেয়ার …

Powered by themekiller.com