চিলমারীতে দিন দিন কমে যাচ্ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। 

হাবিবুর রহমান, চিলমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধিঃ কুড়িগ্রামের চিলমারীতে চরাঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। কর্ম সংস্থানের খোঁজে অনত্র চলে যাওয়া কিংবা কৃষি-জমিতে কাজ করাসহ নানা প্রতি কুলতাকে শিক্ষার্থী কমার জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। চরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান শিক্ষা নিয়ে কাজ করলেও চরাঞ্চলের শিক্ষার মান এখনো কারো নজরে আসেনি। বিশেষ করে সরকারি শিক্ষা প্রশিষ্ঠান গুলোর শিক্ষকদের উদাসীনতায় অনেক শিক্ষার্থী এখন মাদ্রাসামুখী হয়েছেন। এর কারণ হিসেবে অভিভাবকরা বলছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে পড়া-লেখার পরিবেশ নেই। চরের স্কুল হওয়ায় নিয়মিত অনেক শিক্ষকই আসেন না। যেখানে শিশুদের কল-কাকলিতে শ্রেণিকক্ষ মুখর থাকার কথা, সেখানে উপস্থিত কয়েকজন  শিক্ষার্থী। কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের চিলমারী, নয়ারহাট ও অষ্টমীরচর ইউনিয়নের বেশিরভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র এমনি। উপজেলার চরাঞ্চলের একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানেও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম না থাকায় পিছিয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা, বলে মনে করছেন স্থানীয় অভিভাবকরা।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্র বলছে, চিলমারীতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৯৪টি। এর মধ্যে চরাঞ্চলের তিন ইউনিয়নে রয়েছে ২৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়। চিলমারী ইউনিয়নের ৫টি, নয়ারহাটে ৮টি এবং অষ্টমীরচর ইউনিয়নে রয়েছে ১৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়। যদিও চরাঞ্চলে শিক্ষার্থীর উপস্থিতির হার ৭৪% বা এর বেশি বলে দাবি করছেন শিক্ষা অফিস। তবে বাস্তবে এর চিত্র ভিন্ন,উপস্থিতির হার ৭৪% এর কমই হবে। শিক্ষা অফিস জানায়,উপজেলায় প্রধান ও সহকারী শিক্ষকের পদ রয়েছে ৫০১টি। এর মধ্যে শূন্য পদ রয়েছে ৭৬টি। এসব পদের ৩৬টিই চরাঞ্চলের তিন ইউনিয়নের। এর মধ্যে আবার প্রধান শিক্ষক ৯টি ও সহকারী শিক্ষক ২৭টি পদ শূন্য আছে বলে জানায়। কয়েকদিন আগে চরাঞ্চলের কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি একদম কম। নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক ও। চিলমারী ইউনিয়নের গাজীরপাড়া এলাকার চিলমারী ১নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ১৫২জন, কিন্তু উপস্থিত ছিলেন মাত্র সাতজন। শিক্ষক ছিলেন মাত্র দু’জন,অন্য তিন শিক্ষকের কেউ ছুটিতে আবার কেউ অন্য ডিউটিতে। সেই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষ ও ছিল অপরিষ্কার। শিক্ষার্থীদের এমন উপস্থিতির কারণ,করোনায় স্কুল বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছে। সেই সঙ্গে বর্তমানে স্কুলে বিস্কুট প্রতিদিন না দেয়ায় উপস্থিতি কমেছে বলে ব্যাখ্যা দিলেন ওই প্রতিষ্ঠানের উপস্থিত দুই শিক্ষিকা। অথচ ওই স্কুলের শিক্ষার্থীরা তার শ্রেণির নাম ইংরেজিতে বানান করে উচ্চারণ করতে পারেনি। শুধু ওই প্রতিষ্ঠানেই নয় এমন চিত্র একই ইউনিয়নের চরশাখাহাতী ১নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। সেখানে শিক্ষকের উপস্থিতি ছিল মাত্র তিন জন। এর মধ্যে আবার এক শিক্ষক শারীরিক অসুস্থতার কারণে স্কুল ত্যাগ করেছেন। ওই প্রতিষ্ঠানে ১৭০ জন শিক্ষার্থী থাকলে ও উপস্থিত ছিল সর্বমোট ১২জন। ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ও একই ব্যাখ্যা দিলেন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিয়ে। ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষিকা মোছা. লায়লা আর্জুমা বানু বলেন, চরাঞ্চলের অধিকাংশ অভিভাবক অশিক্ষিত। স্কুলে যতটুকু পড়ানো হয় এর বাইরে বাড়িতে গিয়ে পড়ালেখা করেন না কেউ। আর এই অঞ্চলের প্রায় সকলেই কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। তাই বিদ্যালয়ে না এসে মাঠে যায় কাজ করতে। আবার প্রাথমিকের গন্ডি না পেরোতেই চলে যান ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রমিকের কাজ করতে। ওই ইউনিয়নের স্থানীয় এক অভিভাবক বলেন, শিক্ষকরা সময় মতো স্কুলে না আসায় পাঠদান ঠিকভাবে হয় না। তাই বাধ্য হয়ে ছেলেকে মাদ্রাসায় দিয়েছি। শিক্ষকরা দেরিতে বিদ্যালয়ে এসে আবার বাড়িতে চলে যান সময়ের আগেই। ফলে স্বল্প সময়ে প্রতিষ্ঠানের সব শ্রেণির পাঠদান ঠিকভাবে নিতে পারেন না শিক্ষকরা। শাখাহাতী এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, এই স্কুলে শিক্ষকরা আসেন ১১টার দিকে আবার চলে যান ১টা বাজতেই। তাহলে কিভাবে এখানে পড়ালেখা হবে? আর এখানে পড়ালেখা ঠিকভাবে না হওয়ায় ওই স্কুলের শিক্ষার্থীরা অন্য স্কুল মাদ্রাসায় চলে যাচ্ছে। নয়ারহাট ইউনিয়নের খেরুয়ার চর এলাকার বাসিন্দা ওমর আলী বলেন,আমরা তো পড়ালেখা তেমন করি নাই, যার কারণে ছেলে-মেয়েদের বাড়িতে পড়াতে পারি না। স্কুলে যায় আর আসে। এখন স্কুলে তো স্যারেরা ঠিকমতো আসেন না। আমাদের সন্তানদের পড়া-লেখার কী হবে? চরাঞ্চলের দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিও) এ কে এম জাকির হোসেন বলেন,আমি এখানে যোগ দেওয়ার পর থেকে যতটুকু পারি চেষ্টা করেছি কাজ করার জন্য। এখানে শিক্ষকদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে নদী পারাপারে অনেক সময় লাগে। আবার কখনো কখনো নৌকা থাকলে ও মাঝি থাকে না। যার ফলে অনেক শিক্ষকই স্কুলে যেতে কিছুটা দেরি হয়। এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ আবু সালেহ সরকার বলেন,উপস্থিতির সংখ্যা এত কম হওয়ার কথা নয়। আর এখন চরাঞ্চলে ৭৪% এর ওপরে রয়েছে উপস্থিতির হার। স্কুলে সময় মতো যেতে হবে শিক্ষকদের। আর যেহেতু নৌকা দিয়ে পারাপারে সময়ক্ষেপণ হয়। তাই আমরা উপজেলা নির্বাহী অফিসার স্যারসহ শিক্ষাতরী নামে চরাঞ্চলের জন্য নৌকার ব্যবস্থা করে দিব। এতে আর কোনো শিক্ষকের দেরিতে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মাহবুবুর রহমান বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি। চরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাজ করে যাচ্ছি। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা উদ্যোগ নিয়েছি প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন ইউনিয়নে নৌকার ব্যবস্থা করে দিতে। আমরা সামনের মাস থেকে এই শিক্ষাতরী নামক নৌকা চালু করব। যাতে সময়মতো স্কুলে যেতে সমস্যায় পড়তে না হয় শিক্ষকদের । শিক্ষার মানোন্নয়নে আমরা সব শিক্ষককে নিয়ে আলোচনা করব। যাতে চরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি হয়। আর কোনো শিশু যেন ঝরে না পড়ে।
মোঃ হাবিবুর রহমান।
চিলমারী, কুড়িগ্রাম।
মোবাঃ ০১৭৫০-৫০২৬৬১.

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আজকের দিন-তারিখ
  • সোমবার (সন্ধ্যা ৭:৫৪)
  • ৩রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • ৭ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি
  • ১৮ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ (শরৎকাল)
পুরানো সংবাদ
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১