December 8, 2021, 3:21 am

দিন বদলের রোডম্যাপ মহালছড়ি-জালিয়াপাড়া সড়ক

মোহাম্মদ কেফায়েত উল্লাহ, খাগড়াছড়ি থেকেঃ অবশেষে দীর্ঘ দেড় যুগের দুর্ভোগের অবসান ঘটতে যাচ্ছে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মহালছড়ি ও গুইমারা উপজেলার বাসিন্দাদের ; প্রবেশ করতে যাচ্ছে দিন বদলের নতুন রোডম্যাপে। দুই উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক পার্বত্যবাসীকে চলাচলের অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে বছরের পর বছর ধরে। তেত্রিশ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দেয়ার কারণে পণ্য পরিবহন ও যাত্রীদের গুনতে হয়েছে দ্বিগুণের বেশী ভাড়া। প্রায় দেড় যুগ মেরামতের অভাবে মহালছড়ি – সিন্দুকছড়ি অংশের সাড়ে পনেরো কিলোমিটার সড়কের স্মৃতিচিহ্নও মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়। অবশেষে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবীর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর ১৯ ও ২০ ইসিবির মাধ্যমে অবহেলিত সাড়ে বাইশ কিলোমিটার দৈর্ঘের এ সড়ক পুনঃনির্মাণ করা হয়। ফলে প্রতিবেশী দুই জেলার বাসিন্দাদের জীবনচিত্রে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে। যদিও সড়কটি আনুষ্ঠানিকভাবে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি এখনো। তবু্ও এই করোনাকালে ঘরবন্দী স্থানীয় ভ্রমণপিয়াসীদের পদভারে মুখরিত হয়ে হয়ে ওঠেছে বহুলকাঙ্খিত নবনির্মিত এই সড়ক ; হাতছানি দিয়ে ডাক দিয়ে যাচ্ছে যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে দিন বদলের নয়া রোডম্যাপের শুভসূচনার।

জানা যায়, চট্টগ্রাম শহর হয়ে
রাঙ্গামাটি থেকে ঢাকা যেতে অতিরিক্ত ৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। চট্টগ্রাম শহরের যানজট পেরিয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে সময় লেগে যায় ৮-১০ ঘণ্টা। মাঝে-মাঝে আরো বেশী সময় লেগে যায়। অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয়সহ অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তি পোহাতে হয় যাত্রীদের। স্থানীয়দের উৎপাদিত কৃষিপণ্য ও কাপ্তাই লেকের মাছ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছাতেও অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয়ের পাশাপাশি মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে এ ভোগান্তির অবসান চেয়ে আসছিলেন রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার সর্বস্তরের মানুষ ও এতদঞ্চলে ভ্রমনেচ্ছুক পর্যটকেরা। জনদাবির প্রতি সম্মান রেখে সরকার বর্ধিত পরিসরে পুনঃনির্মাণ করেছে মহালছড়ি – জালিয়াপাড়ার এ সংযোগ সড়ক। ফলে দুই উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার পুনঃস্থাপন যেমনটা হয়েছে আবার পাশাপাশি রাঙ্গামাটি – খাগড়াছড়ির যোগাযোগ ব্যবস্থায় নয়াযুগের উন্মোচন ঘটতে যাচ্ছে শীঘ্রই। এর ফলে আরেক দফা বিকশিত হবে এখানকার ক্রমবর্ধমান পর্যটন শিল্প ও ব্যবসা – বাণিজ্যসহ সামগ্রিক অর্থনীতি। প্রতিবেশী দুই জেলার মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটায় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে পর্যটকদের আগমন ঘটবে ব্যাপকহারে। ফলে স্থানীয় পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাবে কয়েকগুণ এবং হোটেল- মোটেল ব্যবসাসহ কর্মসংস্থান হবে ব্যাপকভাবে। মহালছড়ির ব্যবসায়ী সমৃত দাস বলেন, এই সড়ক হওয়ার ফলে ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের ঢাকা- চট্টগ্রামসহ স্থানীয় যোগাযোগের সুবিধা হয়েছে অনেক। এখন আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে সময় বাঁচবে, অর্থ বাঁচবে এবং পর্যটনসহ ব্যবসা বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বাড়বে। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশের উন্নয়ন ঘটবে এবং স্থানীয় সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম কমবে। জালিয়াপাড়ার পরিবহন ব্যবসায়ী ফোরকান আলী বলেন, আমাদের পরিবহন ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটবে। একটি সড়কের অভাবে জালিয়াপাড়া- মহালছড়ি সড়কের দুই পাশের বাসিন্দারা এতদিন প্রচণ্ডভাবে অবহেলিত ছিলেন। এখন শুধু এই এলাকার মানুষের সুবিধাই হবেনা, পুরো রাঙ্গামাটি – খাগড়াছড়ির চাল- চিত্র বদলে যাবে। বিশেষভাবে রাঙ্গামাটি- ঢাকার গাড়ি চলাচলের দরুন পার্বত্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক চাকমা জনগোষ্ঠীর একজন সদস্য বলেন, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও কর্মসংস্থান সহ অনেক সুযোগ- সুবিধা সৃষ্টি হবে ঠিক আছে কিন্তু বিপরীতে এসবের জোয়ারে উপজাতি জনগোষ্ঠীর বাস্তুভিটা হারানোর ঝুঁকিও সৃষ্টি হয়েছে। পর্যটন কারো জন্য বিনোদন আবার কারো জন্য মরণফাঁদ। আমাদের উপজাতিদের মধ্যে সাধারণ মানুষগুলো জনসমাগম হয় এমন এলাকায় থাকতে চায়না। গুইমারা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান উশ্যেপ্রু মারমা বলেন, এই সড়ক নির্মাণের ফলে রাঙ্গামাটি – খাগড়াছড়ির জনগণসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমনেচ্ছুক দেশী-বিদেশী সকল পর্যটক উপকৃত হবে। আমি এই সড়ককে প্রতিবেশী দুই জেলার বাসিন্দাদের দিনবদলের রোডম্যাপ বলবো। এলাকার সামগ্রিক উন্নয়ন হবে সত্যি, তবে পর্যটন খাতের উন্নয়নের জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করেই কাজ করতে হবে। কাউকে উচ্ছেদ করে নয়। পঙ্ক্ষীমুড়া- হাতিমুড়া ও বাদলঘাট পাহাড়কে এক্সক্লুসিভ পর্যটন জোনের আওতায় আনা যেতে পারে। এই সড়কে আরো কিছু কাজ করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। এই সড়ক করতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে পাহাড় কাটা হয়েছে। ওইসব স্থানে রিটেইনিং ওয়াল করা দরকার। অন্যথায় বর্ষায় পাহাড় ধ্বসে পড়ে যেকোনো মুহুর্তে রোড ব্লক হয়ে যেতে পারে। এছাড়াও রাস্তার দুপাশে সাধারন মানুষ কিংবা পর্যটকদের চলাচলের জন্য ফুটপাত করাও বিশেষ প্রয়োজন।

Please Share This Post in Your Social Media

error: Content is protected !!