জেলা পরিষদ নির্বাচনে বিনা ভোটে চেয়ারম্যান হচ্ছেন ১৯ জন

নিউজ  ডেস্ক-জেলা পরিষদ নির্বাচনে গতবারের মতো এবারও অনেকে চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার রিটার্নিং অফিসারদের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে ১৯টি জেলা পরিষদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা ছাড়া আর কেউ মনোনয়নপত্র জমা দেননি। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মনোনয়নপত্র বাছাই এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারে এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যাঁরা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন, তাঁরা হলেন—ফেনীতে খায়রুল বশর মজুমদার তপন, সিরাজগঞ্জে আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, সিলেটে নাসির উদ্দিন খান, লক্ষ্মীপুরে মো. শাহজাহান, নওগাঁয় ফজলে রাব্বী, ঝালকাঠিতে খান সাইফুল্লাহ, মাদারীপুরে মুনির চৌধুরী, টাঙ্গাইলে ফজলুর রহমান খান, নারায়ণগঞ্জে চন্দন শীল, গোপালগঞ্জে আতিয়ার রহমান, বরগুনায় জাহাঙ্গীর কবির, শরীয়তপুরে সাবেদুর রহমান খোকা, ঠাকুরগাঁওয়ে সাদেক কুরাইশি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে রুহুল আমিন, ভোলায় মমিন টুলু, লালমনিরহাটে মতিয়ার রহমান, মৌলভীবাজারে মিছবাহুর রহমান, মুন্সীগঞ্জে মো. মহিউদ্দীন এবং বাগেরহাটে শেখ কামরুজ্জামান টুকু।

ফেনীতে সব পদেই একক প্রার্থী : ফেনীতে সব পদেই আওয়ামী লীগের একক প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চেয়ারম্যান পদে ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খায়রুল বশর মজুমদার তপন, ১ নম্বর ওয়ার্ডে ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম, ২ নম্বর ওয়ার্ডে ছাগলনাইয়া উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী ওমর ফারুক, ৩ নম্বর ওয়ার্ডে জেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু তালেব জেকব, ৪ নম্বর ওয়ার্ডে সদর উপজেলা যুবলীগ সভাপতি নুরুল আফছার আপন, ৫ নম্বর ওয়ার্ডে দাগনভূঞা পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি খায়েজ আহাম্মদ, ৬ নম্বর ওয়ার্ডে চরছান্দিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহিম মানিক এবং দুটি সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ডের সদস্য জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লায়লা জেসমিন বড়মনি এবং দাগনভূঞা উপজেলা আওয়ামী লীগ সদস্য শাহিদা আক্তার শেফালী মনোনয়নপত্র জমা দেন।

রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক আবু সেলিম মাহমুদ-উল হাসান একক প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ও পৌরসভা নির্বাচনেও ফেনীতে বিনা ভোটে জনপ্রতিনিধি হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। ইউপি নির্বাচনে ফেনী জেলার ৪৩টির মধ্যে ৩০টিতে বিনা ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও ১৮টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদের মধ্যে ১৩টিতে একক প্রার্থী থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি।

বিদ্রোহ এড়ানো যায়নি : এ নির্বাচনেও অনেক জেলায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। কয়েকটি জেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে জাতীয় পার্টি ও জাসদের প্রার্থীরাও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

নড়াইল, মেহেরপুর, খুলনা, শেরপুর, চট্টগ্রাম, রাজবাড়ী, পিরোজপুর, দিনাজপুর, হবিগঞ্জ, সুনামগগঞ্জ, পাবনা, চাঁদপুর, চুয়াডাঙ্গা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুর ও পাবনা জেলা পরিষদে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞ মত : জেলা পরিষদ নির্বাচনের এই অবস্থা সম্পর্কে স্থানীর সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, এই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানটি এখন একদলীয় নির্বাচনের ফাঁদে পড়ে গেছে। একটি দল ছাড়া এ নির্বাচনে অন্য কোনো দলের অংশগ্রহণের তেমন সুযোগ নেই। এই একদলীয় নির্বাচনী ফাঁদ প্রতিষ্ঠানটিকেই খাদে ফেলে দিয়েছে। এই অবস্থা থেকে উঠে আসার পথও আপাতত নেই।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাওয়া সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, ‘এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আশা করাই তো ভুল। দেশে এখন যে নির্বাচনী সংস্কৃতি চলছে তাতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বা বিনা ভোটে নির্বাচিত হতে পারাটাকে অর্জন হিসেবে দেখা হয়। জেলা পরিষদ আইন যেভাবে করা হয়েছে তাতে বেশি কিছু আশা করা যায় না। এই আইনে ভোটার যেভাবে করা হয়েছে তাতে ভোট বিক্রির পথ উন্মুক্ত। সাধারণ ভোটার এখানে ভোট দিতে পারবে না। অন্যান্য স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই হচ্ছেন ভোটার। এসব জনপ্রতিনিধি প্রায় সবই ক্ষমতাসীন দলের। আমরা এর আগে ইউপি নির্বাচন কিভাবে হয়েছে তা জেনেছি। ওই নির্বাচনেও অনেকে বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। সে কারণে জেলা পরিষদে একটি দলের বাইরে কারো ভোটার ও প্রার্থী হওয়ার সুযোগও কম। একদলীয় নির্বাচন ছাড়া এখানে অন্য কিছু আশা করা যায় না। ’

আগামী ১৭ অক্টোবর ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করে গত ২৩ আগস্ট পার্বত্য তিন জেলা বাদে দেশের ৬১টি জেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল গতকাল ১৫ সেপ্টেম্বর। মনোনয়নপত্র বাছাই করা হবে ১৮ সেপ্টেম্বর। মনোনয়নপত্র বাছাই নিয়ে আপিল করা যাবে ১৯ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। আপিল নিষ্পত্তি হবে ২২ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৫ সেপ্টেম্বর এবং প্রতীক বরাদ্দ করা হবে ২৬ সেপ্টেম্বর।

জেলা পরিষদ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরা। এই নির্বাচনে এবার ভোট গ্রহণ করা হবে ইভিএমে। আইন অনুসারে জেলায় অন্তর্ভুক্ত সিটি করপোরেশন (যদি থাকে), উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ভোটে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা নির্বাচিত হবেন। জনপ্রতিনিধিরা শুধু ভোট দিতে পারবেন, প্রার্থী হতে পারবেন না।

এবারের জেলা পরিষদ নির্বাচন হচ্ছে এই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় নির্বাচন। এরশাদ আমলে ১৯৮৮ সালে গঠিত জেলা পরিষদে সংসদ সদস্যরাই দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার নতুন করে জেলা পরিষদ আইন প্রণয়ন করে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সালে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে জেলা পরিষদ পরিচালনা করে। আওয়ামী লীগ নেতারাই মূলত প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান।

দেশে প্রথমবারের মতো জেলা পরিষদ নির্বাচন হয় ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর। ওই নির্বাচনে ২১টি জেলায় চেয়ারম্যান প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এ ছাড়া নির্বাচনে ৬৯ জন সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য এবং ১৬৬ জন সাধারণ সদস্যও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। নির্বাচিত চেয়ারম্যানরা শপথ নেন ২০১৭ সালের ১১ জানুয়ারি আর সদস্যরা শপথ নেন ওই বছরের ১৮ জানুয়ারি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আজকের দিন-তারিখ
  • শনিবার (রাত ১২:১৪)
  • ১লা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • ৫ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি
  • ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ (শরৎকাল)
পুরানো সংবাদ