নিয়ামতপুরে হয়ে গেল বাংলার ঐতিহ্য তালতলীতে দ্বিতীয়বারের মত তালপিঠা মেলা

নিয়ামতপুর (নওগাঁ)  সংবাদদাতা ঃপথের দুই ধারে সারি সারি তালগাছ। গাছের ফাঁকে ফাঁকে বসেছে হরেক রকমের পিঠার স্টল। সড়কের মাঝখানে উন্মুক্ত চলছে লোকগান আর নৃত্য। স্টলগুলোতে থরে থরে সাজানো কানমুচড়ী, ফুলঝড়ি, মুইঠা, পুলি, পাতা নকশীসহ হরেক রকমের পিঠা। হরেক রকম পিঠার মাঝে পিঠা উৎসব মাতে, ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ পাওয়া যায় হরেক রকম হাতে। পিঠা মানেই গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য। প্রকৃতি যে কত টা সুন্দর এবং কত ধরনের সাজসজ্জায় নিজের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে পারে তা কেবল নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার হাজিনগর ইউনিয়নের ঘুঘু ডাঙ্গা তালতলী আসলেই অনুধাবণ করা সম্ভব। তাইতো এই প্রকৃতির সৌন্দর্য উদযাপন করার ল্েযই টানা দ্বিতীয় বারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে তাল পিঠের মেলা।
গত বছর থেকে শুরু হওয়ার এই তাল পিঠে মেলা দিন দিন আন্ত জেলা সহ আশপাশের জেলা গুলোর মধ্যে নতুন এক উৎসবের আমেজ সৃষ্টি করেছে সৌখিন মানুষেদের মাঝে। তাল পাতার বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে আসে, তাল পাতার তৈরি খেলনা যত স্মৃতি পটে ভাসে। তাল পাতার ঐ বাঁশির সুরে, মোদের মন উড়িতো আকাশে। মূলত এই তালগাছগুলো রোপন করেছিলেন বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। তখন তিনি ঐ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। উদ্দেশ্য ছিলো বজ্রপাত থেকে রক্ষার পাশাপাশি যোগ হবে বড়তি সৌন্দর্য।
কি নেই এই মেলায়! রয়েছে হরেক রকম তালের তৈরি পিঠে, তাল পাতার তৈরি বিভিন্ন রকমারি জিনিস পত্র। পিঠা প্রেমিদের জন্য রয়েছে তাল পিঠের বিভিন্ন স্টল। নওগাঁ সাপাহার উপজেলা থেকে এসেছেন মিনা পিঠা ঘর নামক একটি স্টল। সেই খানে রয়েছে প্রায় বিশ পদের নানান বাহারি তাল পিঠে। সেইখানে রয়েছে তাল মোহন, তাল বড়া, রিদয় হরণ পিঠা, তালের তৈরি ফুল পিঠা, তালের তৈরি জিলাপী সহ আরো বেশ কয়েক রকমারি পিঠা।
মূলত গত বছর থেকে শুরু হওয়া এই পিঠে মেলা এবারও ২৩ ও ২৪ এ সেপ্টেম্বরে ঘুঘু ডাংঙ্গা তালতলীতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এই বছর ২৪ এ সেপ্টেম্বর মেলা টি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও গত ২ দিন থেকেই পিঠে মেলার আনন্দ বিরাজ করতেছে স্থানীয়দের মাঝে।
শুক্রবার ও শনিবার ছুটির দিনে বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এমনি এক জমজমাট পরিবেশ দেখা যায় নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার ঘুঘুডাঙ্গা তালতলী সড়কে। সারি সারি তালগাছের মনোরম সৌন্দর্যের সড়কটিকে পর্যটকদের কাছে পরিচিত করতে তাল পিঠা উৎসবের আয়োজন করে উপজেলার হাজিনগর ইউনিয়ন পরিষদ।
শনিবার (২৪ এ সেপ্টেম্বর) উক্ত মেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারুক সুফিয়ানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাদ্যমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা সাধন চন্দ্র মজুমদার এমপি।
মনোমুগ্ধকর উপস্থাপক অবসরপ্রাপ্ত এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার বজলুর রশীদের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক খালিদ মেহেদী হাসান পিপিএ, নওগাঁ পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রাশেদুল হক জনপ্রিয় টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব  শাইখ সিরাজ, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফরিদ আহম্মেদ, অফিসার ইন চার্জ হুমায়ন কবির, উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ¦ আবুল কালাম আজাদ, হাজিনগর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক।  উক্ত পিঠা মেলাটি আয়োজন করেছেন উপজেলা পরিষদ নিয়ামতপুর নওগাঁ ।
আয়োজকরা জানান, বিভিন্ন এলাকা থেকে অর্ধশতাধিক সংঠন ও প্রতিষ্ঠান পিঠা উৎসবে অংশ নেয়। উৎসবের আয়োজন যেমন ব্যাপক তেমনি পিঠার সম্ভারও ছিল বৈচিত্রময়। প্রায় ৩০ ধরণের তাল পিঠা ছাড়াও বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে বানানো অর্ধশতাধিক রকমের পিঠা আসে উৎসবে। পাকান, পুলিসহ সচরাচর যেসব পিঠা দোকানে পাওয়া যায়, সেগুলি ছাড়াও ছিল হৃদয়হরণ, ঝিনুক পিঠা, তালের কেক, তালের ফুলঝড়ি, পাখির বাসা, তালের মাংস সিংড়াসহ বিচিত্র সব পিঠা।  প্রতিটি পিঠার দাম ছিল ২০ টাকা থেকে শুরু করে ১০০ টাকা পর্যন্ত।
প্রতিটি স্টলে প্রায় ২০ থেকে ৩০ রকমের পিঠা দেখা যায়। বাড়ি থেকে তৈরি করে আনা পিঠার পাশাপাশি অনেক স্টলে বিভিন্ন রকমের পিঠা তৈরিও করা হয়।
পরিবার নিয়ে নওগাঁর সদর থেকে পিঠা উৎসব দেখতে আসেন রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, সারি সারি তালগাছের সড়কে আসলে এমনিতেই হৃদয়ে একটা প্রশান্তি অনুভব হয়। সময় পেলেই মাঝে মাঝে পরিবার নিয়ে আমি এখানে আসি। আজকে আরও ভালো অনুভূতি হচ্ছে। এখানে একসঙ্গে অনেক রকমের পিঠা পাওয়া যাচ্ছে। আমার সাত বছর বয়সী মেয়ে অনেক পিঠাই আগে চিনতো না। এখানে এসে অনেক ধরণের পিঠা দেখে ও তার স্বাদ নিতে পেরে অনেক খুশি। তাছাড়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকায় আরও ভালো লাগছে।
পিঠা উৎসব উপলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির খাদ্যমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা সাধন চন্দ্র মজুমদার এমপি বলেন, আমি আবেগ আপ্লুত। মানুষ নিজের চোখকে ধরে রাখতে পারছি না। চোখে পানি এসে গেছে। মানুষ কাঁদে এক দুঃখে, আর এক সুখে। আমার চোখে পানি এসে গেছে আজ সুখে। হাজিনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় আশির দশকে হাজিনগর-ঘুঘুডাঙা দুই কিলোমিটার সড়ক জুড়ে এই তালগাছগুলি আমি লাগিয়েছিলাম। আজকে সেই সব তালগাছ বড় হয়ে সড়কটিকে সৌন্দর্যময় করে তুলেছে। মানুষজন এই সড়ক দিয়ে যখন যায়, তালগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে একটু প্রশান্তি পায়। আমি নিজেও এলাকায় আসলে তালগাছগুলি দেখতে আসি। একটা অন্য রকম প্রাশান্তি অনুভূত হয়।
মন্ত্রী আরও বলেন, সড়কটি পর্যটকদের কাছে পরিচিত করতে স্থানীয় চেয়ারম্যান তাল পিঠা উৎসবের যে আয়োজন করেছে এটা একটি ভালো উদ্যোগ। এর মাধ্যমে মানুষ একটা নির্মল বিনোদন পাচ্ছে। পাশাপাশি গ্রাম বাংলার হারিয়ে যেতে বসা অনেক ধরণের পিঠার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে এ প্রজন্ম। আমি হয়তো থাকবো না, কিন্তু আমার দাবী বিশেষ করে ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামবাসীর কাছে প্রতি বছর ২৪ সেপ্টেম্বর যেন তাল পিঠা উৎসব এখানে হয়।
উৎসবের অন্যতম আয়োজক হাজিনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এবারের উৎসবে যে পরিমান মানুষের সাড়া পেয়েছি তাতে আমি অভিভূত । অনেক দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হরেক রকমের পিঠার সমাহার নিয়ে এখানে স্টল দিয়েছে। আগামীতে প্রতি বছর এখানে পিঠা উৎসবের আয়োজনের ইচ্ছে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
মোঃ জামাল  হোসেন
নিয়ামতপুর (নওগাঁ) সংবাদদাতা

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আজকের দিন-তারিখ
  • রবিবার (রাত ১:৩৩)
  • ২৭শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • ৩রা জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি
  • ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল)
পুরানো সংবাদ
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০