উয়ারী-বটেশ্বর দুটি গ্রাম….

মোঃ বকুল মিয়া, স্টাফ রিপোর্টারঃ বাংলাদেশের বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক এক নিদর্শন হলো উয়ারী বটেশ্বর। দেশে পাহাড়পুর, সোমপুর বিহার, মহাস্থানগড়, লালবাগ কেল্লা এবং ষাটগম্বুজ মসজিদ ইত্যাদি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অবস্থান মাটির উপরেই। তবে জানেন কি? মাটির নিচে অবস্থিত এক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আছে এদেশে! আর সেটি হলো উয়ারী বটেশ্বর। হাজার বছরের পুরনো এক দুর্গ নগরী এটি।

উয়ারী-বটেশ্বর বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকা থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে নরসিংদী জেলার বেলাবো ও শিবপুর উপজেলায় অবস্থিত উয়ারী ও বটেশ্বর নামক দুটি গ্রামজুরে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। ধারণা করা হয় এটি মাটির নিচে অবস্থিত একটি দুর্গ-নগরী। বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী এটি প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো।প্রাচীন ব্রক্ষপুত্র নদের তীরে অবস্থিত নদী বন্দর যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বানিজ্যিক সম্পর্ক ছিলো।

ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, উয়ারী-বটেশ্বর ছিল একটি সমৃদ্ধ, সুপরিকল্পিত, প্রাচীন গঞ্জ বা বাণিজ্য কেন্দ্র।
গ্রিক ভূগোলবিদ, টলেমী তার বই “সৌনাগড়া” জিওগ্রাফিয়াতে” উল্লেখ করেছিলেন ।
নরসিংদীর বেলাব উপজেলায় উয়ারী এবং বটেশ্বর পাশাপাশি দুটি গ্রাম। এই গ্রাম দুটোতে প্রায়ই বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান পাওয়া যেত। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে উয়ারী গ্রামে শ্রমিকরা মাটি খননকালে একটি কলসীতে সঞ্চিত মুদ্রা ভাণ্ডার দেখতে পান। স্থানীয় স্কুলশিক্ষক হানিফ পাঠান সেখান থেকে ২০-৩০টি মুদ্রা সংগ্রহ করেন। এগুলো ছিলো বঙ্গভারতের প্রাচীনতম রৌপ্যমুদ্রা।এ ভাবেই ওয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ শুরু হয়। মুহম্মদ হানিফ পাঠান তৎকালীন সাপ্তাহিক মোহাম্মদী পত্রিকায় “প্রাচীন মুদ্রা প্রাপ্তি” শীর্ষক সংবাদ ছাপিয়ে ছিলেন। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে বটেশ্বর গ্রামে স্থানীয় শ্রমিকরা দুটি লৌহপিণ্ড পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে যায়। ত্রিকোণাকৃতি ও এক মুখ চোখা, ভারী লৌহপিণ্ডগুলো হাবিবুল্লা পাঠান তার বাবাকে নিয়ে দেখালে তিনি অভিভূত হন।

প্রত্নতাত্ত্বিকরা বারবারই এ ব্যাপারে সোচ্চার থাকলেও হচ্ছিল না খননকাজ। অবশেষে ২০০০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে শুরু হয় খননকাজ। খননকাজে নেতৃত্ব দেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান সুফি মোস্তাফিজুর রহমান। পুরো খননকাজেই সক্রিয় ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

আবার ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে আবিষ্কৃত কিছু প্রত্ন নিদর্শনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ড এবং নিউজিল্যান্ড তিনটি দেশের পরীক্ষাগারে কার্বন-১৪ পরীক্ষার প্রেক্ষিতে উয়ারীর বসতিকে খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০ অব্দের বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর উয়ারী-বটেশ্বর এলাকায় উৎখনন কর্ম চলমান রেখেছে। সর্বশেষ ২ জানুয়ারী ২০১৭ তারিখে উয়ারীতে উৎখনন কালে বেশ কিছু প্রত্ননিদর্শন সংগৃহীত হয়েছে।

বর্তমানে উয়ারী-বটেশ্বরে দেখার মতো নিদর্শনের মধ্যে আছে- পরিক্ষা সম্বলিত ৬০০×৬০০ মিটার আয়তনের ৪টি দুর্গ-প্রাচীর ও অসমরাজার গড়। উয়ারী-বটেশ্বর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে শিবপুর উপজেলায় মন্দির-ভিটা নামে একটি বৌদ্ধ মন্দির, বৌদ্ধ পদ্ম মন্দির, চুন-সুরকি নির্মিত রাস্তা ও বৌদ্ধবিহারের পাশাপাশি ইটনির্মিত বিশেষ স্থাপত্য বৌদ্ধ কুণ্ড (কূপ) বা পুকুনিয়া (পুকুর)।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আজকের দিন-তারিখ
  • রবিবার (রাত ৩:২৩)
  • ৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ
  • ১৪ই রজব, ১৪৪৪ হিজরি
  • ২২শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ (শীতকাল)
পুরানো সংবাদ
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮