বৃষ্টি নামলেই ছাতা হাতে বের হওয়া এখন খুবই স্বাভাবিক। নারী-পুরুষ সবাই রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচতে এটি ব্যবহার করেন।
কিন্তু ছাতার ইতিহাসে এমন সময়ও ছিল, যখন এটি মূলত নারীদের সামগ্রী হিসেবেই বিবেচিত হতো। পুরুষের হাতে ছাতা ছিল অস্বাভাবিক, এমনকি উপহাসের কারণও।
ছাতার ইতিহাস অন্তত তিন হাজার বছরের পুরোনো। টি. এস. ক্রফোর্ডের ‘এ হিস্ট্রি অব দ্য আমব্রেলা’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রাচীনকাল থেকেই এর ব্যবহার ছিল।
তবে তখন সাধারণ মানুষ নয়, সমাজের নির্দিষ্ট শ্রেণিই ছাতা ব্যবহার করত।
রাজকীয়তা থেকে নারীদের সামগ্রী
প্রাচীন মিসরে ফারাওদের রোদের তাপ থেকে রক্ষা করতে ছাতা ব্যবহার করা হতো।
পরে চীন, আসিরিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতাতেও এর ব্যবহার দেখা যায়। ফলে ছাতার সঙ্গে রাজকীয়তা ও অভিজাত শ্রেণির সম্পর্ক তৈরি হয়।
তখনকার ছাতা অবশ্য বৃষ্টি ঠেকানোর জন্য ছিল না; মূলত সূর্যের আলো থেকে সুরক্ষাই ছিল এর উদ্দেশ্য। বিশেষ করে নারীরা ত্বকের সৌন্দর্য ধরে রাখতে রোদের হাত থেকে মুখ আড়াল করতে ছাতা ব্যবহার করতেন।
প্রাচীন গ্রিস ও রোমে ছাতাকে অনেকটা নারীদের সামগ্রী হিসেবেই দেখা হতো। পুরুষের জন্য এটি ছিল ‘নারীসুলভ’। ইউরোপের বিভিন্ন অংশে এই ধারণা বহু শতাব্দী টিকে ছিল। এমনকি ফ্রান্সে প্রায় ১৭ শতকে জলরোধী ছাতা তৈরি হওয়ার পরও ১৮ শতক পর্যন্ত পুরুষদের মধ্যে এর ব্যবহার খুব একটা জনপ্রিয় হয়নি।
এক ইংরেজের হাত ধরে বদলে গেল ধারণা
ইংল্যান্ডে পুরুষদের ছাতা ব্যবহারের ধারণা জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব দেওয়া হয় ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী জোনাস হ্যানওয়েকে।
বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের সময় ছাতার ব্যবহার দেখে তিনি ১৭৫০-এর দশকে বৃষ্টিভেজা লন্ডনের রাস্তায় ছাতা হাতে বের হতে শুরু করেন। কিন্তু লন্ডনবাসী বিষয়টি সহজভাবে নেয়নি। অনেকে তাকে প্রকাশ্যে উপহাস করতেন। সবচেয়ে বেশি বিদ্রূপ আসত ঘোড়ার গাড়ির চালকদের কাছ থেকে।
বৃষ্টির দিনে গাড়িতে চড়ার চাহিদা বাড়ত বলে চালকদের আয়ও বাড়ত। হ্যানওয়ে ছাতা ব্যবহার করায় সেই অতিরিক্ত আয়ের সম্ভাবনা কমছিল। তাই তার প্রতি চালকদের বিরূপ মনোভাব ছিল আরও তীব্র। তবে এসব বিদ্রূপ তাকে দমাতে পারেনি।
হ্যানওয়ের মৃত্যুর পর ১৭৮৬ সালের কিছুদিনের মধ্যেই লন্ডন গেজেটে ছাতার বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। ধীরে ধীরে ছাতা শুধু নারীদের জন্য নয়, বৃষ্টি থেকে সবার সুরক্ষার সামগ্রী হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
ছাতার পর চায়ের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ
ছাতা জনপ্রিয় করার পাশাপাশি হ্যানওয়ে ছিলেন নানা সামাজিক উদ্যোগের সমর্থক। তিনি নৌবাহিনীর জন্য ক্যাডেট নিয়োগে সহায়তা করতে মেরিন সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। শিশুদের জন্য পরিচালিত ফাউন্ডলিং হাসপাতালের নির্বাহী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। চিমনি পরিষ্কারক শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্যও কাজ করেছেন।
তবে তার আরেকটি আলোচিত উদ্যোগ ছিল চায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান। ১৭৫৬ সালে প্রকাশিত ‘অ্যান এসে অন টি’ বইয়ে তিনি চা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, কর্মদক্ষতার পথে বাধা এবং দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করেন।
তার এই বক্তব্যও জনসাধারণের হাস্যরসের বিষয় হয়ে ওঠে। বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখক ও অভিধানপ্রণেতা স্যামুয়েল জনসন-ও লিটারারি ম্যাগাজিনে হ্যানওয়ের বক্তব্যের জবাব দিয়েছিলেন।
চায়ের বিরুদ্ধে হ্যানওয়ের প্রচেষ্টা সফল না হলেও ছাতার ক্ষেত্রে তিনি সফল হন। যে জিনিস একসময় পুরুষের জন্য ‘নারীসুলভ’ বলে বিবেচিত হতো, সেটিই আজ নারী-পুরুষ সবার দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী। বৃষ্টির দিনে হাতে ছাতা নিয়ে বের হওয়া এখন এতটাই স্বাভাবিক যে, কয়েক শতাব্দী আগের সেই উপহাসের গল্প বিশ্বাস করাই কঠিন।



