ছোট্ট মশার কামড়ও হতে পারে ভয়ংকর

নানারকম রোগ ছড়ানো আর মানুষকে বিরক্ত করাই যেন মশার কাজ। আকার আকৃতিতে  ছোট হলেও পৃথিবীর ভয়ংকর ও এবং বর্তমানে আতঙ্কময় প্রাণীর নাম মশা। একটা  ছোট্ট মশার কামড়ও ভয়ংকর হতে পারে। মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া,  ডেঙ্গু, ফাইলেরিয়া, জাপানিজ এনকেফেলাইটিস, জিকা ভাইরাস ও হলুদ জ্বরের মত মারাত্মক বিভিন্ন রোগ হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর অন্য যেকোনো প্রাণীর  চেয়ে মশার কারণেই মৃত্যু হয় সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের।

কীটতত্ত্ব নিয়ে বাংলাদেশে যে কজন গবেষক আছেন তাদের একজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহ আলম। ৪২ বছর শিক্ষকতার পর ২০১৬ সালে অবসরে যান। ২০০০ সালে যখন বাংলাদেশে  ডেঙ্গু রোগের সংক্রমণ  দেখা  দেয়, তখন এই  রোগের বাহক এডিস মশা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন এই অধ্যাপক।  প্রচারপত্র ছাপিয়ে বিলিও করা হয়েছিল নগরীতে।  ড. শাহ আলমের মতে, মশা নিয়ে বিশেষত এডিস মশা নিয়ে গবেষণাকে রাষ্ট্র খুব একটা গুরুত্ব  দেয়নি। অথচ ৫০ বছর আগে ১৯৭০ সালেই ঢাকায় এই  রোগের বাহক হিসেবে এডিস মশা শনাক্ত হয়েছিল। গবেষণার ওপর  জোর দিয়ে এই মশা নিমূর্লের জন্য যদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা হতো, তাহলে বাংলাদেশে এই ‘ক্রাইসিস পিরিয়ড’ তৈরি হত না।  ডেঙ্গু সংক্রমণের পর চিকিৎসার চেয়েও এডিস মশা  মোকাবেলা  বেশি জরুরি বলেও মত দিয়েছেন এই গবেষক।

নিধন হয়না- মশারা ফিরে আসে
কটি ছোট্ট মশার কামড় কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা হয়তো আমরা অনেকেই জানি না। এই মশা কেবল আমাদের রক্তই চুষে নেয় না, সাথে বয়ে আনে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো প্রাণঘাতী সব রোগ। অবহেলায় একটি মশার কামড় পুরো পরিবারের সুখ-শান্তি কেড়ে নিতে পারে।

মশাদের বংশ কি একেবারে ধ্বংস করা সম্ভব? এর জবাব হবে না। একেবারেই সম্ভব নয়।  কারণ বিজ্ঞানের  কোনো শাখায়ই পৃথিবী সব মশা  মেরে  ফেলার মতো  কোনো অস্ত্র তৈরি হয়নি। তবে মশা নিধনের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই আশাবাদী। নিত্যনতুন সব পদ্ধতি আসছে মশা নিধনের। ব্যাকটেরিয়া ছিটিয়ে দিয়ে মশার বাসস্থান নষ্ট করে  দেওয়ার একটি পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলছে। অপর এক মশা নিধনের পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলছে,  যেখানে প্রাণঘাতী  রোগ ছড়িয়ে  দেয় এমন সব মশা মারা যাবে।

 

মশা মারার জন্য ডিডিটি ও এর মতো শক্তিশালী কিছু কীটনাশক জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় অনেক  দেশে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়েছে। এসব শক্তিশালী কীটনাশক ছাড়া মশার বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণই কঠিন,  সেখানে মশা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার চিন্তাই করা যায় না। জানাগেছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক স্থানে মশা পুরোপুরি দূর করার  চেষ্টা চালানো  হলেও শেষমেষ টিকে থাকার লড়াইয়ে মশারাই জয়ী হয়।

বিভিন্ন গবেষণা তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯৫০-৬০ দশকে মশা দূর করতে লাতিন আমেরিকায় বিশেষ উদ্যোগ  নেওয়া হয়। ব্যাপক হারে ডিডিটিসহ বিভিন্ন শক্তিশালী কীটনাশক ব্যবহার করা হয় পুরো মহাদেশে। কিছু সময়ের জন্য মশা দূর হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই ধীরে ধীরে মশা ফিরতে শুরু করে। ধারণা করা হয়, সেখানকার মশা দূর হলেও এশিয়া বা আফ্রিকার জাহাজ থেকে আবার মশা ফিরে আসে। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞদের মত,  কোনো  দেশ বা শহর কর্তৃপক্ষ যতই কীটনাশক ব্যবহার করুক না  কেন, কিছু মশা রয়েই যায়। আর ওই মশা  থেকে আবার বিপুল পরিমাণ মশা তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়েসের মশক নিধন কর্মসূচির কর্মকর্তা রজার এস নেস্কির মতে, পৃথিবীর সব মশা  মেরে  ফেলা অসম্ভব কাজ।

বিশ্ব মশা দিবস :  ডেঙ্গুর কারণেই মশা দিবস আলোচনায়

আমাদের অনেকেরই জানা নেই ২০ আগস্ট- ‘বিশ্ব মশা দিবস’। ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপের কারণেই এবার বিশ্ব মশা দিবস নিয়ে বাংলাদেশ তৎপর হয়েছে। এর আগে এই দিবস স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান কিংবা স্বাস্থ্য প্রশাসন  কোনো তৎপরতাই চালায়নি। তাই এই দিবসটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে  মুটেও পরিচিত নয়। ১৯৩০ সাল থেকে প্রতি বছর দিবসটি পালিত হয়। ১৮৯৭ সালের ২০ আগস্ট ম্যালেরিয়া রোগের কারণ আবিষ্কার করেন ব্রিটিশ চিকিৎসক রোনাল্ড রস। এই আবিষ্কারের জন্য তিনি পরে চিকিৎসা শাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান। তার সম্মানে যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন দিবসটি পালন শুরু করে। ডেঙ্গুর মহামারির কারণে বাংলাদেশে সম্প্রতি মশা বিষয়ে ব্যাপক আতঙ্কের পাশাপাশি জনসচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। আর এরই মধ্যে ২০ আগস্ট মশা দিবস হওয়ার কারণে বাংলাদেশে এই প্রথমবার বিশ্ব মশা দিবস পালিত হয়। গবেষকদের মতে, প্রতিবছর প্রায় সাড়ে আট লাখ মানুষ মশাবাহিত  রোগে মারা যায়।  সে কারণে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে সচেতনতা বৃদ্ধিতে এই দিবস পালনে আনুষ্ঠানিকতা বাড়ছে।

মশা দিয়েই মশাবাহিত  রোগ  থেকে মুক্তি
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ  মেক্সিকো  স্টেট ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক জানিয়েছেন, তারা মশা না মেরে মশাবাহিত রোগ থেকে মানুষজাতিকে রক্ষার এক অভিনব কৌশল আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে।  রোগবাহী মশা যাতে নতুন করে প্রজনন প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে নতুন বংশধর জন্ম দিতে না পারে  সেজন্য প্রজনন নিষ্ক্রিয় পুরুষ মশাকে কাজে লাগাতে চান। এই প্রক্রিয়ায় যদি সত্যি সত্যি পর্যাপ্ত সংখ্যক নিষ্ক্রিয় পুরুষ মশাকে মশার প্রজনন ক্ষেত্রে প্রবেশ করিয়ে দেয়া যায় তাহলে মশার স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে।

মশার প্রজনন ক্ষেত্রে থাকা প্রজননক্ষম পুরুষ মশারাও তখন খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারে না। নিউ মেক্সিকো স্টেট ইউনিভার্সিটির ওই বিজ্ঞানীরা পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রক্রিয়ায় সাফল্য লাভ করলেও অনেকেই এর বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।  কারণ এই প্রক্রিয়ায় ল্যাবে কি পরিমাণ নিষ্ক্রিয় মশা তৈরি করা যাবে এবং এই মশাদের প্রজনন ক্ষেত্রে পাঠানোর প্রক্রিয়া কতটা বাস্তবায়নযোগ্য তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। জার্নাল অব ইনসেক্ট সাইন্সে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।

মশার কামড়ে যেসব রোগ হয়

ম্যালেরিয়া
মশার কারণে মৃত্যুগুলোর বড় একটি অংশ আসে ম্যালেরিয়ায়। স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার কামড়ে এ রোগ ছড়ায়। সাধারণ কামড়ানোর ১০-১৫ দিন পর এর লক্ষণ প্রকাশ পায়। এর মধ্যে আছে জ্বর, মাথা ব্যথা ইত্যাদি। চিকিৎসা থাকলেও কখনো কখনো প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে রোগটি। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ২৪ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হন। এটির প্রভাব সবচেয়ে বেশি আফ্রিকায়। পৃথিবীর মোট ম্যালেরিয়া সংক্রমণের ৯৫ শতাংশ ও মৃত্যুর ৯৬ শতাংশ আফ্রিকায়।

ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস
রোগাক্রান্ত মশার কামড়ে এ রোগ হয় মানুষের। আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণের মধ্যে আছে জ্বর, মাথা ব্যথা, ঘাড় শক্ত হওয়া, কাঁপুনি, খিঁচুনি, এবং পেশির দুর্বলতা। আক্রান্তদের শতকরা ৮০ শতাংশেরই কোনো উপসর্গ পাওয়া যায় না। তবে তাতে কী, এটা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে কখনো কখনো।

ইয়েলো ফিভার
মশার কামড়ে হওয়া আরেকটি ভয়াবহ রোগ ইয়েলো ফিভার বা পীতজ্বর। বিশেষ করে সতোরো থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু দেখে পৃথিবী এ রোগে। এডিস এবং হিমোগগাস মশার কামড়ে এ রোগ হয়। আফ্রিকা, মধ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকায় এ রোগের প্রভাব দেখা যায়। মাথাব্যথা, জ্বর, পেশি ব্যথা এবং বমি বমি ভাবের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এ রোগে কারও কারও বেলায় যকৃৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জন্ডিস হয়ে যায়। আর এতে শরীরে হলুদাভ ধরাতেই এ রোগের এমন নামকরণ।

চিকনগুনিয়া
মূলত এডিস অ্যাবোপিকটাস বা এশিয়ান টাইগার মসকুইটোর কামড়ে রোগটি হয়। গত কয়েক দশকে এ রোগটি বেশি ছড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশেও এ রোগটিতে আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে অনেককে। এডিস ইজিপ্টিও ছড়াতে পারে চিকনগুনিয়া বেশ কয়েকটি ভ্যাকসিন নিয়েও কাজ করলেও এখনো এর সত্যিকার অর্থে কোনো প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি। জ্বরের সঙ্গে হাড়ের জোড়ায় তীব্র ব্যথাই এই রোগের প্রধান উপসর্গ। সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখ জ্বালাপোড়া, বমিভাব, শারীরিক দুর্বলতা এসব থাকতে পারে।

সূত্র: হেলথ সায়েন্স, বিবিসি সায়েন্স ফোকাস,  টাইমস হিন্দুস্তান

Leave a Reply

Your email address will not be published.

পুরাতন সংবাদ
October 2026
T W T F S S M
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930